Report

স্বর্গের দ্বীপে অনাহার: সেন্টমার্টিনের দিনরাত

Shamsul Arif Fahim

Contributor, Centre for Critical Discourse

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত বিশ্বের বিরল প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের প্রাকৃতিক মনোরম সৌন্দর্য পর্যটকদের বরাবরই আকর্ষণ করেছে। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে দ্বীপবাসীর গভীর আর্থ-সামাজিক বঞ্চনা। এই বঞ্চনার গল্প সচরাচর মূলধারার গণমাধ্যম কিংবা জনপ্রিয় নস্টালজিক বাংলা চলচ্চিত্র ‘দারুচিনি দ্বীপ’-এও উঠে আসেনাই; বরং আড়ালেই থেকে যায়।

এই আর্থ-সামাজিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করে ২০২৪ সালে, যখন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দ রেজওয়ানা হাসানের উদ্যোগে সেন্টমার্টিনে পর্যটনে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এরপর অনেক সময় পেরিয়ে গেলেও বাস্তবতা বদলায়নি। বর্তমানে বছরে মাত্র দুই মাস পর্যটন চালু থাকলেও বাকি সময় দ্বীপবাসীদের ক্ষুধা ও কষ্টে দিন পার করতে হয়।

এই পর্যটননির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামোর পেছনে রয়েছে প্রায় দুই দশকের প্রেক্ষাপট। একসময় এই দ্বীপের মানুষের প্রধান জীবিকা ছিল মাছ ধরা। কিন্তু কয়েক বছর ধরে অতিরিক্ত মুনাফার আশায় দ্রুত এবং অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠে পর্যটন খাত। ফলে অধিকাংশ মুনাফা চলে যায় বাইরের মালিকানাধীন রেস্তোরাঁ ও হোটেল মালিকদের হাতে, আর ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রবালসহ অন্যান্য বিরল প্রাকৃতিক সম্পদ।

স্থানীয় এক হোটেল মালিক আয়াস আক্ষেপ করে বলেন, “ট্যুরিজম তো আগে ছিল না, বাপ-দাদারা মাছ ধরে খেত এবং কৃষিকাজ করতো । এখন সব বিক্রি করে রিসোর্ট বানিয়ে বসে আছি যে কবে সিজন আসবে।”

রিসোর্ট ও হোটেলে কাজের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয়দের কথায় উঠে আসে পরিবেশ দূষণের চিত্রও। শুক্কুর নামে এক কর্মচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দ্বীপের মানুষ নিজেরাই বর্জ্য পরিষ্কার করে। কিন্তু বাইরের বড় বড় রিসোর্ট তাদের ময়লা সরাসরি সাগরে ফেলে। তারা টাকা কামিয়ে ব্যাংকে রাখবে, আর ময়লা আমাদের ভোগ করতে হবে। সিজন শেষে দ্বীপবাসীর ভাগ্যে থাকে শুধু প্লাস্টিক।”

পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক সংকটও তীব্র হচ্ছে। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ বা দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ গড়ে ওঠেনি। ফলে পর্যটননির্ভর এই অর্থনীতি কতটা অনিশ্চিত, তা স্থানীয় বাসিন্দা জিহাদের অভিজ্ঞতায় স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। তিনি বলেন, “স্থানীয় মানুষের রিসোর্ট কম, বাইরের লোকজনই কামায়। আগে ছয় মাস সিজন ছিল, তখন ব্যবসা করে চলা যেত। কিন্তু গত বছর মাত্র দুই মাস সিজন ছিল এতে খরচই ওঠেনি, ঋণ শোধ তো দূরের কথা।”

শুক্কুর আরও বলেন, “এই দ্বীপ এখন সাধারণ মানুষের হাতে নেই। এখানে লক্ষ-কোটি টাকার ব্যবসা হয়, কিন্তু দ্বীপের মানুষের উপর এমন বোঝা চাপানো হয়েছে যে তারা হার্টফেল করবে অথবা আত্মহত্যা করবে।”

“সেন্টমার্টিন থেকে টেকনাফে যেতে গর্ভবতী নারীদের অনেক কষ্ট হয়, বিশেষ করে আবহাওয়া খারাপ থাকলে। সবার আর্থিক অবস্থা ভালো না। পর্যটন খাতও বন্ধ থাকে। একজন জেলের পক্ষে ৫ হাজার টাকা দিয়ে স্পিডবোটে যাওয়া সম্ভব নয়। তখন সবকিছু আল্লাহর উপর ছেড়ে দিতে হয়।”

অন্যদিকে, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও মৌলিক সুবিধাবঞ্চিত দ্বীপবাসীদের কষ্ট বিশেষ করে নারীদের অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। খায়রুল বানু নামে এক নারী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “কিছুই নেই। চিকিৎসা নেই। চার দিন আগে আমার বাবা মারা গেছেন। কবরের জন্য বাঁশও পাইনি। দ্বীপের মানুষ মিলে ব্যবস্থা করেছে। সরকার একটা বাঁশও দেয় না।” ঘটনাটি ঘটে ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে।

এই ঘটনার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা যায়, পর্যটনে অতিরিক্ত বিধিনিষেধের কারণে বাংলা চ্যানেলে অর্থনৈতিক সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য মূল ভূখণ্ড থেকে সময়মতো সেন্টমার্টিনে পৌঁছাতে পারেনি। এমনকি মৃত্যুর পর দাফনের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীও মানুষ সরকারি সহায়তা থেকে পায়নি।

একজন চিকিৎসক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, “সেন্টমার্টিন থেকে টেকনাফে যেতে গর্ভবতী নারীদের অনেক কষ্ট হয়, বিশেষ করে আবহাওয়া খারাপ থাকলে। সবার আর্থিক অবস্থা ভালো না। পর্যটন খাতও বন্ধ থাকে। একজন জেলের পক্ষে ৫ হাজার টাকা দিয়ে স্পিডবোটে যাওয়া সম্ভব নয়। তখন সবকিছু আল্লাহর উপর ছেড়ে দিতে হয়।”

পাশাপাশি, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে মৃত্যুর ঘটনাও বাড়ছে। এক সদ্য মা বলেন, “যাদের সামর্থ্য আছে তারা বাইরে গিয়ে চিকিৎসা নেয়। আর যাদের টাকা নেই তারা দাই মা (ধাত্রী) উপর নির্ভর করে। অনেকেই টেকনাফ যাওয়ার পথেই মারা যায়।” অর্থাৎ, আর্থিক অসামর্থ্যের কারণে প্রসূতি মায়েরা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় স্থানীয় দাইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

জীবিকা সংকট কীভাবে সামাজিক সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে, তা জিনজিরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জনাব আয়াসের বক্তব্যে স্পষ্ট। তিনি বলেন, “প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকটে বাল্যবিয়ে বাড়ছে। এতে মা ও শিশু— কারও পুষ্টি নিশ্চিত হয় না। আয় না থাকায় নারী ও শিশুরা না খেয়ে থাকে, চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতেও পারে না।”

স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়েও রয়েছে গভীর হতাশা। এক নারী বলেন, “আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত— সবই আছে। কিন্তু তারা কি আমাদের ভাত দেয়? আমরা গরিব মানুষ। তারা নেতা হয়ে পরে আমাদেরই ক্ষতি করে।” আরেক নারী বলেন, “নেতারা সবাই জমি দখল করেছে। এখন আবার ক্ষমতায় আসতে চায়।”

এছাড়া, বিদ্যুৎ সরবরাহের ইজারাদার হিসেবে ‘ব্লু মেরিন কোম্পানি’ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। সেন্টমার্টিন স্টুডেন্ট ইউনিটির আহ্বায়ক জামিল উদ্দিন বলেন, “ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৬৫ টাকা এবং বাসাবাড়িতে ৬০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণভাবে এই কর্পোরেট কোম্পানির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ ছাড়া, দ্বীপবাসীর চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় না। অভিযোগ জানাতে গেলে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বিষয়ে লেখালেখি করলে কোম্পানি স্থানীয় যুবদলের আহ্বায়ক আলী হায়দারকে দিয়ে হুমকি-ধমকি দেওয়াচ্ছে।” সুতরাং, স্থানীয় বাসিন্দাদের এসব অভিযোগ থেকে এই ধারণা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় বেশি ব্যস্ত।

অন্যদিকে, পর্যটন বন্ধ থাকলেও জেলেদের উপর নানা ধরনের বঞ্চনা অব্যাহত রয়েছে। মাছ ধরার ক্ষেত্রে স্থানীয় কোম্পানির আধিপত্য এবং সরকারি নিষেধাজ্ঞা মাঝিদের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। মাঝি কেরামত আলী (ছদ্মনাম) বলেন, “আমরা মাঝির অধীনে মাছ ধরি। টাকা দেয় কোম্পানি। ১ লাখ টাকার মাছ ধরলে আমরা পাই ২৫-৩০ হাজার টাকা। বাকি ৭০ হাজার কোম্পানি নিয়ে যায়।” এতে উৎপাদনের উপর জেলেদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি জেলেদের জীবনে নতুন সংকট তৈরি করেছে। গত এক বছরে আরাকান বাহিনীর হাতে ৪০০-র বেশি জেলে নিখোঁজ হয়েছেন। এর মধ্যে অর্ধশত ফিরে এলেও ৩০০-র বেশি জেলের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি ৭৩ জন জেলে ফেরত এলেও আবার নতুন করে ২০-র বেশি জেলেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই জেলেদের অধিকাংশই সেন্টমার্টিন, শাহপরীর দ্বীপ এবং টেকনাফ এলাকার বাসিন্দা।

যেসব জেলে ফিরে এসেছেন, তাদের জন্য ন্যূনতম চিকিৎসা কিংবা অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও নেই। মদিনা খাতুনের দুই ছেলে আলমগীর ও জাহাঙ্গীর ২০২৫ সালের আগস্টে আটক হন এবং ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ফেরত আসেন।

জাহাঙ্গীর তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, “আমাদের সারাক্ষণ নির্যাতন করা হতো। শিকল বেঁধে কাজ করানো হতো। এতে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পচন ধরেছে।” তিনি আরও বলেন, “আমার চার বছরের বাচ্চা আমাকে চিনতে পারছে না। সে বলে, আমার বাবা তো উনি না, আমার বাবা তো মারা গেছে।”

আলমগীর বলেন, “ঋণ নিয়ে বোট কিনেছিলাম। কিন্তু বোট ফেরত না পাওয়ায় আয় বন্ধ হয়ে গেছে। ঋণও মওকুফ হয়নি। এখন আবার ঋণ নিয়ে আগের ঋণ শোধ করতে হচ্ছে।”

১৬ বছর বয়সী জিল্লুর রহমানের জীবনে এই সংকট আরও কঠিন বাস্তবতা তৈরি করেছে। তার বাবা আমানউল্লাহকে ২০২৫ সালের ০১ নভেম্বর মাছ ধরার সময় আরাকান বাহিনী ধরে নিয়ে যায়। সেই ট্রলারে পাঁচজন জেলে ও একজন মাঝি ছিলেন। মাঝি জিয়া রহমান ফিরে এলেও জিল্লুরের বাবা আর ফেরেননি।

জিল্লুর রহমান বলেন, “বাবা চলে যাওয়ার পর এখন আমাকে দেড় বছরের ছোট বোন আর মায়ের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। মাসে ৫ হাজার টাকা আয় করে তিনজনের সংসার চলে না। চালের বস্তার দামই ২-৩ হাজার টাকা। আমি এই কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না, আমি আমার বাবাকে ফিরে পেতে চাই।”

সেন্টমার্টিন আজ এক জটিল বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিপণন, অন্যদিকে মানুষের টিকে থাকার সংগ্রাম। অপরিকল্পিত পর্যটন, বিকল্প জীবিকার অভাব, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সংকট এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা— সব মিলিয়ে দ্বীপটি বহুমাত্রিক সংকটে নিমজ্জিত।

পরিশেষে, বাংলাদেশের সকল স্তরের নাগরিক, ছাত্র-শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি সেন্টমার্টিনের বাসিন্দাদের আহ্বান যাতে উপরোক্ত সমস্যাগুলোর সমাধানে বাংলাদেশ সরকারকে দ্রুত কার্যকর ও মানবকেন্দ্রিক নীতি গ্রহণে চাপ প্রয়োগ করা হয়। অন্যথায়, এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ ক্রমেই আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে।

© 2026 CCD | Designed & Developed by
INCODEX